বিয়ের আগে বড় হওয়া পর্যন্ত একজন মেয়ে বেশির ভাগ তার মা, বাবা, ভাইবোন, আত্মীয় এবং একজন ছেলে বাড়ির আপনজন ছাড়া ও অনেক বন্ধু-বান্ধব ও সংগঠনের সাথে জড়িত থেকে অনেক কিছুই শেয়ার করে। কিন্তু বিয়ের পর ছেলেরা কারো না কারো সান্নিধ্য পেলেও মেয়েদের সে সুযোগ কম। এ অবস্থায় মেয়েদের সবকিছু শেয়ার করার এক মাত্র অবলম্বন এবং দায়িত্ব যিনি হন তিনি স্বামী।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিবাহ বা বিয়ের বিভিন্ন নাম রয়েছে । ইংরেজিতে ম্যারিজ, ফ্রান্সে মারিয়াজ, চীনে হুন-ইন, জার্মানে কেক্কোন, রাশিয়ায় ব্রাক,জাপানে এহে, পর্তুগালে কাসামানতো, তামিলে থিরুমানাম,অনেক আরব দেশে জাওয়াজ ও উর্দুতে সাদিসহ আরোও অনেক। প্রায় চার হাজার বছরের ও বেশি সময় আগে এ বিয়ে প্রথা চালু হয়েছিল বর্তমান ইরাকের মেসোপটিমিয়ায় । তখন এ বিয়ের নাম ছিল বেল্টু বা বেলিটাম।
কবুল উচ্চারণ করে হোক, সাতপাঁকে বাঁধায় পড়ে হোক, বিহারে দুইহাত এক করে কিংবা গীর্জায় গিয়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে অথবা নানা ধর্মীয় রীতিনীতিতে নারী-পুরুষ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বিবাহে প্রথম দেখায় দুইটি মনের একটি শব্দ “ভালোবাসা’ দিয়ে শুরু । মানুষ যে বলে ভালোবাসা, ভালোবাসা এ ভালোবাসা ৪টি বর্ণ দিয়ে গঠিত হলেও স্বাথী-স্ত্রীর ভালোবাসা সবচেয় বড় ও পবিত্র। এ ভালোবাসায় দুইটি জীবনকে এক করে দেয় অনন্ত কালের জন্য। মাটির পৃথিবী আকাশ থেকে অনেক দূরে হলেও যেমন তাদের মিলন ঘটে। ঠিক তেমনি পূর্বে দেখা নেই, জানা নেই এমন দুইটি জীবনকে বিয়ের মাধ্যমে ভালোবাসায় এক করে মহামিলন ঘটায়। গানের ভাষায়,’ ইয়ে জিন্দেগী ওসি কী হ্যায় জো কিসিকা হুগায়া, পেয়ার মে কো গায়া,। অর্থাৎ একটি জীবন দুইটি জীবনের ভালোবাসায় হারিয়ে যায়। তারা ধীরে ধীরে একটি মোহনায় মিলিত হয়ে যায়। বিবাহ,ধারায় পুরাতনকে বিদায় করে নতুনদের স্বাগত জানায়। এ ধারা চিরন্তন, চলছে স্বর্গ- মর্ত্য ছেয়ে অনন্তকাল ধরে।
বিবাহিত সংসার অনেক চড়াই উৎরাই এর মধ্য দিয়ে চলে। স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার বন্ধন অটুট হলে,পারস্পরিক বিশ্বাসে মিলেমিশে চলতে পারলেই সংসার সুন্দর হয়। তাদের ভালোবাসা অনেকটা ইংরেজি লেটার ‘W’ এর মত। বিয়ের পর প্রথম প্রথম ভালোবাসা পিক পয়েন্টে অর্থাৎ উপরে থাক। পরে ছেলেমেয়ে হলে তাদের মানুষ করতে গিয়ে ধীরে ধীরে নিচেনেমে আসে। আবার ছেলেমেয়েরা মানুষ হয়ে গেলে ভালোবাসা বেড়ে যেতে থাকে। কিন্তু নাত-নাতনি হলে এদের মানুষ বা তাদের কথা চিন্তা করে আবার কমে যায়। সর্বশেষ ছেলেমেয়ে, নাত নাতনি সবাই যখন বড় ও মানুষ হয়ে যায় আবার উচ্চ শিখড়ে পৌছে যায়। আবার স্ত্রী স্বামীর এবং স্বামী স্ত্রীর কথা বা পরামর্শ নিয়ে চললে কোন সাংসারিক সমস্যা হয়না। আদর্শ স্ত্রী ও স্বামী সবকিছু লুকাতে পারলেও তাদের একের প্রতি অন্যের ভালোবাসা কখনোই লুকাতে পারেন না। পরস্পরের ভালোবাসা তারা অতি সহজেই বুঝে ফেলে। যখন স্ত্রী স্বামীকে অথবা স্বামী স্ত্রীকে যে কোন প্রকার উপহার দেন তখন তাদের খুশিতে যেন স্বর্গ নেমে আসে।
বিবাহ একটি সামাজিক উৎসব। ছোট বড় ও ধনী গরিব নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষে তাদের বিবাহ উৎসবকে আজীবন স্মরণ রাখে। এ উৎসবের কথা কেউ কোনদিন ভুলতে পারে না। যখন কোথাও মানুষ কোন বিয়ের অনুষ্ঠান দেখে তখন নিজেদের বিয়ের উৎসবের কথা স্মরণ করেন। আবার কোন কোন বিয়ে উৎসবের স্মৃতি আজীবন মনে থেকে যায়। বিয়ে কিংবা বিয়ে উৎসবের কথা শুনলে অশীতিপর বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সবার মনে নতুন রোমাঞ্চ সৃষ্টি করে।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক যে, আজকাল বিয়ের পবিত্র বন্ধনকে ছিন্নভিন্ন করা হয়ে থাকে। সামান্য মনের গড়মিল হলেই সুন্দর সাজানো সংসার ভেঙ্গে তছনছ হয়ে যায়। পবিত্র বন্ধনে গড়ে উঠা ভালোবাসা নিরবে নিভৃতে কাঁদে। একটি অপছন্দনীয় শব্দ ‘ তালাক বা ডিভোর্স নরক থেকে এসে যেন স্বর্গে অট্রহাসি দেয়। দিনের পর দিন ডিভোর্সের হার বেড়েই চলেছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় সেলেব্রেটিরা ডিভোর্স নামের কালো পতাকা এগিয়ে যাচ্ছেন । ছেলে অথবা মেয়ে এক জন অপর জন আলাদা হয়ে কিছু দিনের মধ্যেই আবার অন্যজনকে বিয়ে করে ফেলে। কিন্তু তখন আর ওটি বিয়ে থাকে না। হয়ে যায় হাঙ্গা। কারোও স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যু বরণে আবার বিয়ে করলে সমাজ মেনে নিয়ে কিছুটা ভালো চোখে দেখলে ও ছাড়াছাড়ির পর আবার অন্য কাউকে বিয়ে আমাদের সমাজ মোটেও মেনে নিতে চায় না। এমন করলে পুরুষদের বলা হয় হাঙ্গাইল্লা আর মেয়েদের হাঙ্গাইল্লনী। তাদের মাথা হেঁট করে চলতে হয়। বাকি জীবন তেমন সুখের হয় না। যখন সংসারে ভাঙ্গন লেগে যায় তারা বুঝতে পারেনা। ভালোবাসার একটি বড় অর্থ যাকে ভালোবাসি তার জন্য ছাড় দেওয়া ও ঝুঁকি নেওয়া। কেউ আবার প্রথম বিয়েকেই শ্রেষ্ঠ মনে করে জীবন ব্যাপী আফসোস করে যায়। কবি আলেকজান্ডার পোপের কবিতা অবলম্বনে অস্কার জয়ী সিনেমা” ইটারনাল সানসাইন অব দ্যা স্পটলেস মাইন্ডে’ দেখানো হয়েছে কেন মানুষ স্মৃতি বিমুখ হয়। আবার কী ভাবে আগের জায়গায় ফিরে আসা যায়। এ ছবিতে হিরোইন ক্লেমেন্টাইন একটি সময়ে এসে স্বামী জোয়েলকে ও সম্পূর্ণ ভুলে যায় ও স্মৃতি থেকে মুছে ফেলে। জোয়েল ও ক্লেমেন্টাইনকে তার স্মৃতি থেকে মুছতে চেষ্টা করে কিন্তু ব্যর্থ হয়। ক্লেমেন্টাইনকে অনুরোধ করে কম করে একটি স্মৃতি হলেও যেন সে মনে রাখে। ক্লেমেন্টাইন জোয়েলের অনুরোধ রাখতে চেষ্টা করে অতীতের সবকিছু ফিরে পায়। তাদের মাঝে পুরনো ভালোবাসা আবার জেগে উঠে এবং তারা এক থেকে যায়।
যে সমস্ত মানুষের মনে কোন প্রকার পাপ ও লোভ নেই তারা সব ভুলভ্রান্তি ভুলে যেতে পারেন। তাদের জীবনটাই উজ্বল হয়। তাদের জীবনে সূর্য একই আভায় কিরণ বর্ষণ করে যায়। নিস্পাপ, নিস্কলুষ এবং পবিত্র মনের অধিকারী হতে পারলেই জীবন সুখময় হয়। বৈবাহিক জীবনে যারা এমন রয়েছেন এবং থাকবেন তাদের জন্য আবার ও অভিনন্দন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।